নাম তার রূপালী
একটি মেয়ের গল্প । ভাল হত যদি শোনাতে পারতাম এক মিষ্টি
প্রেমের গল্প । কিন্তু সে গুরেবালি । আজ আমি তোমাদের শোনাবো এমন এক গল্প যেটা ভীষন গ্লানির ও মর্মান্তিক হলেও ভয়ংকর সত্যি ।
নাম ছিল রূপালী কর্মকার । বাস ছিল নতুন মুম্বাই এর এক বস্তি এলাকাতে । এক কামরা ঘড় তাতেই রূপালী তার অন্য তিন ভাই ও বাবার সাথে থাকতো । রূপালী ছিল সবার থেকে বড় । গরীব পরিবার । মাথাগোঁজার মতো ঐ এক ফালি জায়গা ছিল তাদের । অনেক অসুবিধার মধ্যেও সুবিধা ছিল তাদের পারস্পরিক ভালোবাসায় । বাবা সারা দিন বাইরে থাকতো । কাজের চাপ ছিল অনেক । বাড়ি বাড়ি জলের পাইপ মেরামতির বা সারানোর কাজ ছিল বাবার । ইনকাম যা হতো তাতে পাঁচটা মানুষের দুবেলা পেটের ভাত জোগাড় হয়ে যেতো । তবে বাবাকে তার জন্য সারাদিন কাজ করতে হতো । বড়ভাই সোমেন ১২ক্লাস পাশ দিয়ে বাবার সাথে কাজে হাত লাগানো শুরু করে । বাবা ও বড় ভাই সোমেন সকাল বেলা ৬ টা নাগাদ কাজে যায় । ৬টার আগে তাদের খাবার তৈরি করতে হত রূপালীকে । প্রতিদিন ভোর থাকতে উঠতে হত তাকে । টিফিন ও সাথে নিয়ে যেতো বাবা ও ভাই । তার অপর দুই ভাই রমেন ও অধর স্কুলে পড়তো । রমেন ক্লাস ৮ ও অধর ক্লাস ৬ এ পড়তো । অধর জন্ম নেওয়ার পর তাদের মা মারা যায় । সে ও প্রায় বছর পাঁচেক । তখন থেকেই রূপালীকে সংসারের হাল ধরতে হল । পড়াশোনা ছেড়ে সকলের রান্না করা, খাবার জোগাড় করা, ঘড় পরিষ্কার কাপড় কাচা, ছোটভাই দের দেখাশোনা তাকেই করতে হতো।এতো পরিশ্রম করেও সে ক্লান্ত হতো না কারণ সকলেই তাকে খুব ভালবাসত।
যাইহোক এভাবেই চলছিল কর্মকার পরিবার । সবার ইচ্ছে থাকে বড় হওয়ার । ভাল থাকার ও ভাল রাখার । রূপালীর বাবা পরিতোষ কর্মকার ও চাইতেন জীবনে বড় কিছু করার । পরিবারের আর্থিক সমস্যা কিছু কম করার ইচ্ছা তো সকলেরই হয় ।পরিতোষ বাবু ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না।
ঈশ্বর সকল কে সুযোগ দেন । বলা যায় পরিতোষ বাবু ও সুযোগ পেয়েছিলেন । মালভানি ,মালাড এলাকাতে কামাত সাহেবের বিরাট প্রাসাদ । কামাত সাহেবের বাড়িতে পরিতোষ বাবু আগে অনেকবার পাইপ সারাইয়ের কাজ করেছেন । কামাত সাহেব প্রোমোটার মানুষ । তাঁর নতুন প্রোজেক্ট ওয়াসিতে । একদিন কামাত সাহেব পরিতোষ বাবুকে ডেকে পাঠিয়ে তার নতুন প্রোজেক্টে জলের পাইপ লাইন বসানোর কাজ দিলেন । অনেক বড় কাজ । সাত তলা বাড়ি । প্রত্যেক তলায় দশটার বেশি ফ্লাট । সত্যি বড় কাজ । আর ও অনেক লোক জোগাড় করতে হবে । মালপত্র সব কামাত সাহেব দেবেন কিন্তু লোকের ব্যবস্থা পরিতোষ বাবুকেই করতে হবে । কাজে দেরি করা চলবেনা । যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ শেষ করতে হবে বলেছিলেন কামাত সাহেব ।
নতুন কাজ ও অগ্রিম বায়না পেয়ে পরিতোষ খুব খুশি মনে বাড়ি ফিরেছিল সেদিন ও সব কথা রূপালি ও সোমেনকে বলেছিল । বাবার কথা শুনে তারাও খুব খুশি হয়েছিল । পরিতোষ অনিশ্চয়তার হাত থেকে কিছুদিনের মুক্তি পেয়ে খুশি হয়েছিল। সোমেন বড় কাজের ব্যাপকতা পেয়ে খুশি হয়েছিল । আর রূপালী খুশি হয়েছিল সচ্ছলতার কথা ভেবে । যাইহোক কর্মকার পরিবারে ভালবাসা তো ছিলই তার সাথে সুখের হাতছানি দেখা দিয়েছিল ।
বস্তিবাসীর কাজের অভাব লেগেই থাকে ।পরিতোষ বাবুর লোক যোগার করতে বিশেষ অসুবিধা হয়নি । কাজ যথারীতি শুরু হয়ে ছিল । যত কাজ এগোতে লাগলো ততবেশি পরিতোষ বাবু কাজের মধ্যে ডুবে যেতে লাগলেন । পরিতোষ সারাদিন মালপত্র যোগার করতো । সব ফ্লাটে তো এক ধরনের মাল চলে না । সোমেন কাজ সামলাত । খুব খাটনি । বাড়ি ফিরতে রোজই রাত্রি হয়ে যেতো । বাড়ি ফিরেই বাপের সাথে সোমেন ও মুখে কিছু গুঁজে শুয়ে পড়তো । জীবনটা এভাবে এগিয়ে চলছিল । ভালবাসাছিল । সুখ এর হাত ধরে আনন্দ হঠাৎ ঐ বস্তিবাসী বাঙ্গালী পরিবারে ডুকে পরেছিল কোনও আগাম বার্তা ছাড়াই ।
এই অবসরে আমার রূপালীর কথা বলা প্রয়োজন ।২২-২৩ বছরের রূপালীর গায়ের রং ছিল কালো কিন্তু মসৃণ । গড়ন ছিল আঁটসাঁটও । সুন্দর মুখশ্রী ও মাথা ভর্তি কোঁকড়ানো কালোচুল সহজেই আদিবাসী মেয়ের কথা মনে করিয়ে দিত । লাবণ্যময়ী সুঠামস্বাস্থ্য, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা, আরস্ঠস্বভাব ও কর্তব্যপরায়ণ মন সকলকে আকর্ষণ করতো । সে বিশেষ ঘড়ের বাইরে যেতো না । সারাদিন ঘড়ের কাজ নিয়ে ব্যস্ত রূপালী নিজের পরিচর্যার বিশেষ সময় পেতোনা । তার বিশেষ বন্ধু ছিল বলেও জানা যায়না । মা বেঁচে থাকা কালীন কয়েক ক্লাস অবধি স্কুলে যায়নি তা নয় তবে সে বিশেষ লেখাপড়া জানতোনা ।
মুম্বাই এর বস্তি এলাকায় মিশ্র সংস্কৃতি দেখাযায় । ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ সেখানে বাসকরে । সকলই যে গরীব-শ্রেণীর মানুষ হয় তা নয় । আবার সকলেই পাজী হয় তাও নয় তবে বস্তি এলাকার নিয়মকানুন বেশিটাই তৈরি হয় সমাজবিরোধী ও রাজনৈতিক মস্তানদের মর্জিমত । শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ দিন মজুরের কাজকরে ও অশিক্ষিত ।তারা অপরাধ প্রবণ ও নারী-বিদ্বেষী । কপুমন্ডুকমনোবৃত্তির মানুষ যেখানে নিয়ম তৈরি করে সেখানে সাধরন মানুষ শান্তি পায় কি ভাবে ?
এই বস্তিতে রূপালীর মত চারা গাছটি নিজের মত জল সিঞ্চন করে বাঁচতে পারবে এটা আশা করা ভুল । বহু বিপরীতমুখী চোরাস্রোতের মধ্যে নিজের কক্ষটিতে তাকে বাঁচতে হত যদিও তা কখনো প্রকাশ করেনি বাবার অসহায় অবস্থার কথা জান ছিল বলে।
বস্তির মস্তান অমানুষ প্রভুনাথ দেশমুখ রূপালীকে নিশ্চিত ভাবেই আলাদা করে চিহ্নিত করে ফেলেছিল । রূপালী তার মেধার দ্বারা বিপদের থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলতো সমঝোতা না করে ।
এইছিল আমার রূপালী । ছিল বলছি কারণ আজ আর সে নেই । তার এই না থাকাটা পুরুষসমাজের অপমান । হাড়িয়ে যাওয়া রূপালীর জন্য কোনও মোমবাতি জ্বলেনি । আমার কাঁচা হাতের কয়েক পাতার ছোটগল্পটা তার আত্মার শান্তির জন্য একছোট্ট প্রচেষ্টা ।……
রূপালীর হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা জানতে গেলে আমাদের একজন মানুষকে জানতে হবে । তার নাম প্রভুনাথ দেশমুখ । সামান্য হলেও তারসাথে পরিচয় হওয়া দরকার । প্রভুনাথ দেশমুখ এক রাজনৈতিক মস্তান । শীর্ণচেহারা, মুখে খোঁচাখোঁচাদাড়িগোঁফ, তার বেশির ভাগ পাকা, দুচারগাছি কাঁচাদাড়ি মুখে আলো আঁধারেরই ভাষা আনে । লম্বাটে মুখ, মাথার চুল সব সময় উসকোখুসকো । সবসময় ধমকে চলেছে, কোনকিছুতেই খুশিনয় । সব সময় দেড় খানা চোখে চেয়ে আছে । একটা চোখ ট্যারা । মদেরনেশায় ফিট প্রভুনাথের চাহনি বীভৎস । বেশির ভাগ সময় পরনে কালচে রং এর জিনস । পেছনে চ্যাপটাবোতল। সাথে বাইক তাতে সবসময় চাবি গোঁজা। সে যেন আস্ত একটা ঝড় । কোথাও নাই স্থায়ী ঠিকানা। সাথে ভজনলাল ছায়াসঙ্গী।ভজনলাল ছাড়াও তার আছে অনেক সাগরেদ।
বস্তির ঠিক মধ্যস্থলে একমন্দির । লোকে বলে বাবা কপিলশ্বরের মন্দির । এইমন্দির কে আশ্রম ও বলা হয়।সারারাত আশ্রমে বাবার ভক্তদের আনাগোনা লেগে থাকে। সকালে বাবার মন্দিরে মেঝেতে দেখা যায় মদের বোতল। মাংসের হাড় ছিটিয়ে থাকে পাশবিক কাজের চিহ্ন হিসাবে । এদের কোনকিছুই নির্দিষ্ট ছিলনা।ঘরে এদের লক্ষ্মী না থাকলেও রাতে লক্ষ্মীর অভাব হতনা । কখনো টাকার জোর কখনোবা গায়ের জোরে।
এদের মূলকাজ ছিল তোলাবাজি ও ছিনতাই । সেই অর্থে তারা খুব বড় কাজ করতো বলে মনে হতনা । তাদের ও অনেক পাওনাদার থাকে । সবাইকে দিয়ে থুয়ে বিশেষকিছু তাদের হাতে থাকতো না । তারপর ফুর্তি করার জন্য প্রায় সবটাই চলে যতো ।দিনের প্রথমে তাদের হাতে ও থাকতো শূন্য।
মন্দিরের চারপাশে ঘনবসতি । সরুগলি। দিনেরবেলাতে ও অন্ধকার। গলিতে যান বলতে শুধু বাইক চলে অন্যথায় এগারোনম্বর ভরসা । পাশাপাশি দুজন মানুষের চলাভার । এহেন রাজ্যের রাজা প্রভুনাথ কোনও এককালে মুম্বাইএর কোনও এক সুতাকলে চাকরি করতো শোনাযায় । বার কয়েক জেলে যাওয়ার পর কোনও এক রাজনেতার সহযোগী প্রভুনাথ আজ বিরাট মস্তান।এই বস্তির সর্বময় কর্তা।
যাইহোক প্রভুনাথকে বস্তির সকলে ভয় করতো তার নানাবিধ কারণ ছিল। প্রভুনাথের কিছু বিশেষ কাজ ছিল । বিজনেসে, পাবলিকরিলেশনে প্রভুনাথের মাঝে মাঝেই ডাক পড়তো । রাজনেতা মন্ত্রী হলেও মূলত ছিলেন ব্যবসায়ী । ব্যবসার খাতিরে শিক্ষিত, সুপ্রতিষ্ঠিত ভ্রষ্টাচারী মানুষকে খুশি করার দায়িত্ব ছিল প্রভুনাথের ।এইকাজ সে কৃতিত্বের সাথে করতো ।
এদের কথাবলার প্রয়োজন হল কারণ পরের ঘটনা বুঝতে গেলে এদের চেনা প্রয়োজন ছিল । এইরকম একটা পরিবেশে শুধু কর্মকার পরিবার নয় আরও অনেক পরিবার বাস করতো ও করে।সত্যি বলতে ভারতবর্ষের অনেকটা অঞ্চলে আজ এদেরই রাজত্ব।………
যাইহোক এইভাবে চলছিল কর্মকারসংসার । এ কথাঠিক অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছিল। অর্থজীবনের সবকিছু ঠিক করেনা তবে এটাঠিক অর্থ জীবন কে কিছুটা সহজ করে ও অনেক সমস্যা সমাধান করতে সাহায্য করে।একটা মানুষকে জানতে গেলে তার আর্থিকঅবস্থানটা আমাদের প্রথমে জানতে হয়।আর্থিক অবস্থা জানা হয়ে গেলে আর বিশেষ কোন পরিচয় প্রয়োজন হয়না বিশেষ করে তার শ্রেণীটা যদি গরিবিরেখার নীচে হয়।সেই অর্থে পরিতোষবাবুর পরিচয়ের আর প্রয়োজন নাই কিন্তু দিলে ক্ষতি ও নাই ।
সেইভাবে আহামরি কিছু বলারও নাই। চল্লিসাউর্দ্ধ পরিতোষবাবুর জীবনে অপ্রাপ্তি সব, প্রাপ্তিরঘরশূন্য । আদতে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের মানুষ । দেশভাগের নামে কিছু মানুষকে কষাই এর হাতে তুলে দেওয়ার পরও যে কয়েকটা পরিবার তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে সবলজ্জার মাথা খেয়ে নিজের দেশে বেঘর হয়ে বেঁচেছিল এই কর্মকার পরিবার তাদের মধ্যে একটি । ওদেশে মানুষ যৌথভাবে জীবনযাপন করতো । একটি যৌথপরিবারে ২৫-৩০ জন মানুষ এক ছাদের নীচে বাসকরতো । পূর্বপাকিস্তানে যদিবা ঐ পরিবারটিকে ছিল বাংলাদেশ হওয়ার পর আর টিকতে পারলো না । মুজিব হত্যার পর২৫-২৬ জনের বিরাট এক যৌথপরিবার উদ্বাস্তু হয়ে যখন এদেশে চলে আসে পরিতোষ তখন শিশু । উদ্বাস্তুক্যাপএ কেটেছে বহুদিন—একবেলা আহারে উল্লাসিত হওয়ার অভিশাপ তার ছেলেবেলা থেকে । টিনের দরমা দেওয়া ঘর তার কাছে নতুন নয়।বলাযায় দারিদ্র তার জীবনসাথী । বাবা কাজ জুটিয়েছিল কাঁকিনারা জুটমিলে । তাতেই ভাতের যোগার হত। বাবা ছিলেন ভাল মেকানিক। জুটমিলের এক সাহেবের অনুরোধে পরিতোষের বাবা বোম্বাইয়ের কোনও টেক্সটাইল মিলে কাজ নিয়ে একউচ্চ স্বপ্ন নিয়ে সপরিবারে বোম্বাই পাড়ি দেন । সেই অর্থে পরিতোষ বাবার হাত ধরে প্রথম মুম্বাই এসেছিল।কয়েক বৎসর ভালই কেটেছিল।বিধিবাম।শুরু হল দত্তসামন্তের খেলা । সব মিল বন্ধ হয়ে গেল । আবার পরিতোষ সপিবারে বস্তিতে ঠাঁই পেলো।পাইপের কাজ বাবার কাজেই শেখা । ৩০ জনের সেই একান্নবর্তী পরিবার আজ ৫ জনে সীমাবদ্ধ ।দারিদ্রের জ্বালা সহ্য হল না।পরিতোষের স্ত্রী চলে গেল রূপালী ও তিন ছেলের জিম্মা দিয়ে । অনেক বস্তি ঘুরে আজ পরিতোষের নিউবোম্বের এই বস্তিতে ৮ফুট বাই ৭ফুট একমাত্র বাসস্থান।আজ পরিতোষ স্বপ্ন দেখতে ভয় পাই।ঘরপোড়া গরু রাঙ্গা মেঘ দেখলেই ভয় পাবে তা তে অন্যায় কোথা যদিও এটা সত্যি তার অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছিল……
অনেক কথা বলা হল যার হয় তো প্রয়োজন ছিল অথবা ছিলনা । হয়তোবা বলা হল অথবা হল না।এবার আমাকে একসত্য ঘটনা বলতেই হবে।বলতে ভয় করলে অথবা কুণ্ঠা করলে তো হবেনা।রং ঢেলে রঙ্গিন করার উপায় ও নাই । এ একসত্য ও এটাই গল্পের মূল ঘটনা ।
বেশ সুখেই কাটছিল দিন । সকলের মনে কিছু স্বপ্ন উঁকি দিচ্ছিল।সে যত সামান্য হোক স্বপ্নের অন্য নামজীবন । নিত্যদিন পরিতোষ ও সোমেন কাজে যায়।যদিও রাত্রি হয় তবুও বাড়ি ফিরে আসে নির্দিষ্ট সময়ে।সকলে অপেক্ষায় থাকে তাদের।রাতে একসাথে খাওয়া । বেশ চলছিল জীবন।সকালে রমেন ও অভয়ের স্কুল যাওয়া সবই ছিল ঠিকঠাক।মানুষের সাধ্য থাকলে সাধও জাগে।আগে বাজার ঘাট পরিতোষই করতো।আজকাল কাজের চাপে এইকাজটা ও রূপালীকেই করতে হয়।বিশেষ অনিচ্ছা থাকলেও উপায় ছিল না ।
বড় রাস্তার গায়ে লাগানো বস্তি।বড় রাস্তাতে নেমে বস্তিতে ঢোকার মুখে কদমগাছ । কদমগাছের নীচে চায়ের দোকান । প্রভুনাথের একটা ঠেক।তবে কখনো রূপালীকে কেউ কিছু বলতো না এটা সত্যি । বড়রাস্তা থেকে অনেকটা পথ বস্তির মধ্যে দিয়ে তাকে চলতে হত। মেয়েদের নাকি ত্রিনয়ন থাকে। রূপালী বেশ বুঝতে পারতো কেউ যেন তাকে অনুসরণ করছে। নিজেকে নিজেই সাহস যোগাতো মনের ভুল ভেবে। এখানেও একই কথা । এক মাত্র সমাধান ছিল…… Close your eyes…… Clutch your heart………. Bluff your
mind and say….. All is well…...All is well…..রূপালী সেটাই করতো ।
যাইহোক তারপর ও সে সুখী ছিল । একদিন সকলেই বাড়ির বাইরে। শুধু রূপালী ঘরে নিজের কাজে ব্যস্ত।রমেন ও অভয় ফিরে আসার আগে সে সব কাজ সেরে ফেলতে চায়। দুইভাই ফিরে আসে বিকেল চারটে নাগাদ ।
দিনটা ছিল ১৬ই মে ২০১১ সাল সোমবার । যথারীতি সেদিন রমেন ও অভয় স্কুল থেকে ঠিক সময়ে ফিরে ছিল।বাড়ি ফিরে অন্যদিনের মত আর দিদির দেখা পায়নি।দরজা তো খোলাই থাকতো । শুধু এক পরদা ছাড়া আরতো কিছু ছিল না তাদের দিদিকে আব্রু দেওয়ার।সে পরদা ও ছিলনা সেদিন।ঘরে যেন উলটপালট।চারদিকে সব ছড়ানো । বাসনপত্র সব মেঝেতে ছড়িয়ে । বইগুলোসব এধারওধার বিছানো।কারা যেন সব নিয়ে ছোড়াছুড়ি খেলেছে । যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র।ঠিক মনেহল কেউ যেন ধারালো ছুরি দিয়ে ছোট্ট সাধের এক মাত্র আশ্রয়টা কে ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছ । এই পরিস্থিতিতে তাদের একমাত্র ভরসা ছিল দিদি কিন্তু সে কোথায়।তাদের ছোট অবুঝদুজোড়াদৃষ্টি হারিয়ে যাওয়ার আগে হঠাৎ খুঁজে পেলো দিদির ফোন টা মেঝেতে। রমেন ভাইকে জড়িয়ে ধরে ফোন করলো বাবাকে । ঠিক কি বলবে সে জানে না । জানাল দিদি নেই । ভয় করছে । এরবেশি বলার মত সাহস ও ভাষা তাদের ছিল না । বাচ্চা মানুষের ভয় প্রকাশ পায় তার কান্না দিয়ে কিন্তু আশ্রয়হীন দুভাই, তাদের কান্না হারিয়ে ফেলে ছিল সেদিন।দুভাই ঘরের বাইরে এসে দরজার মুখে বসলো বাবার অপেক্ষাতে । আশেপাশের সব দরজা বন্ধ।সকলেই হয়তো আজ ঘর ছাড়া। ঘন্টা দুই পর বাবা ও দাদা বাড়ি এলো।অবাক সবাই।প্রকাশের কোন ও ভাষা নাই । দুচোখ দিয়ে সকলেই খুঁজে চলেছে তাদের সব থেকে প্রিয়জন দিদিকে।
সকলে এক শোকের মধ্যে আচ্ছন্ন হলেও সোমেন প্রথম তার বাবাকে পুলিশের কথা বলল। পরিতোষবাবুর অসহায় দুটো চোখ । সে জীবনের ভয়ংকররূপ অনেক দেখেছে। কিন্তু আজ সকলকে ছাড়িয়ে যে রূপের পরিচয় সে পেলো তার জন্য সে হয় তো তৈরি ছিল না ।
অনেকটা সময় পার হয়ে গেল । পরিতোষবাবু সোমেনকেই বললেন থানায় যেতে। তিনি সব শক্তি হারিয়ে ফেলে ছিলেন। ঘরে রইলেন রমেন ও অভয়কে সাথে নিয়ে ।
ঘণ্টা খানেক পর পুলিশ এলো । প্রথম প্রশ্ন রূপালীর কোনও প্রেমিক ছিল কি না ও থাকলে সে কোথায় থাকে। সত্য সেলুকাশ কি বিচিত্র এই দেশ । ......অবিশ্বাস্য হলে ও এটাই সত্যি........
রূপালী হারিয়ে গেল । রূপালী কোথায় গেল জানা যায়নি । রূপালীর জন্য কোনও মোমবাতির মিছিল হয়নি।রূপালীর জন্য কোনও NGO কে দেখা যায়নি পথে নামতে । শুধু কোনও এক ইংরেজি দৈনিকে কয়েকটা লাইন ছাপা হয়ে ছিল যার ধরন ছিল…
... This is RUPALI, a 24-yr old girl from Malvani,
Malad, and Mumbai…..She was kidnapped from her locality in the month of May
2011…..A complaint was made to police but of no use.……
নিয়মমাফিক পুলিশ তার কাজ হয়তো করেছিল । পরিতোষ কয়েক মাস ঐ বস্তির বাসায় রূপালীর জন্য অপেক্ষা করেছিল । সোমেন আর কাজে যেতে পারেনা । দিদির কাজ তাকেই করতে হয়।কর্মকার পরিবারের জীবন থমকে গেলে ও থেমে যায়নি । জন্মদাগ থেকে মৃত্যুচিহ্ন অবধি জীবন চলে, যেন এক মহাবিশ্বের কোন এক রহস্য জনক সজ্ঞাহীনসত্তার নির্দেশে । পরিতোষবাবু উদ্দেশ্যহীন জীবন যাপন করছিলেন কিন্তু সংযম হারিয়ে ফেলেননি। জীবনে ঘটনা ঘটে জীবনকে টেনে নিয়ে যাবার জন্য কিন্তু এই ঘটনা পরিতোষবাবুকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল ।
অল্প সময়ের মধ্যে কামাতসাহেব পরিতোষবাবুর কাজেখুবখুশি হয়ে ছিলেন । বিশেষ করে তাঁর সততা ও নিষ্ঠার পরিচয় কামাতসাহেব পেয়ে ছিলেন । কামাতসাহেব পরিতোষের এই বিপদের কথা জানতেন । প্রজেক্টের মধ্যে কিছু অস্থায়ী থাকার ঘর বানানো হয় বিশেষ করে দারোয়ান ও সুপারভাইজারদের জন্য । একটা ঘর খালি ছিল । কামাতসাহেবের অনুরোধে পরিতোষ তার সংসার নতুন করে সেখানে শুরু করলো। সোমেন আবার কাজে যোগ দিল। রমেন ও অভয় নতুন বাসায় এসে বোধহয় অনেকটা দিদির কথা ভুলে গেলো। রূপালী চিরতরে হারিয়ে গেলো ।
কাহিনীটা এখানে শেষ করতে পারলে সবথেকে খুশি হতাম আমি কিন্তু তাতে রূপালীর উপাখ্যান সম্পূর্ণ হত না ।
কে বা কারা রূপালী কে অপহরণ করেছিল জানা যায়নি । কিন্তু রূপালীকে প্রায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় ৫মাস পর । এটা জানা যায় বা অনুমান করা যায়, অপহরণের প্রধান কারণ ছিল ধর্ষণ। রূপালীকে ৫জনপুরুষ (ডাক্তারি পরীক্ষা অনুযায়ী) বহুবার ধর্ষণ করেছিল । কিন্তু মনে করা হয় কিছুদিন পর ধর্ষণ কারীদের মোহ কেটে যায় । তখন এক বিরাট প্রশ্ন আসে তাদের মনে । "WHO WILL SPEND MONEY FOR HER FOOD???" তারা এই দায়ীত্ব একে অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করে। খবরে প্রকাশ তারা একটা বড়াপাও ৪-৫দিন অন্তর রূপালীর জন্য বরাদ্দ করেছিল ।
৫মাসপর জুহুবীচের কাছ এক বাগানে প্রায় মৃত কঙ্কালসার রূপালীর দেহ বস্তাবন্দি অবস্থায় পাওয়া যায় । পুলিশ রূপালীর চিকিৎসা এক সরকারি হাসপাতালে শুরু করে। সেখানে চিকিৎসার ত্রুটি হয়নি অসহায় রূপালীর । মূলত শুধু হাড়গুলো বস্তা বন্দী অবস্থায় পুলিস যখন পায়, রূপালী তখন স্তব্ধ হয়ে গেছিল । সে ছিল বাক্যরহিত।
চিকিৎসকদল তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল । তার কয়েকটা অপারেশন ও হয় । খবরে জানা যায় তার পাকস্থলীর মধ্যে চিকিৎসকরা কাগজ,মাটি ও নুড়ি পেয়েছিল। চিকিৎসকদের মত অনুযায়ী খিদে পেলে রূপালী খিদের জ্বালায় বড়াপাও এর সাথে দেওয়া কাগজ খেয়ে ফেলত । চিকিৎসকদের মত অনুযায়ী রূপালী এতো বেশী ক্ষুধার্ত ছিল যে মাটি ও নুড়িপাথর ও খেয়ে ফেলত । চিকিৎসকদের মতে রূপালীর অবস্থা ছিল বর্ণনাতীত ।
রূপালী হারিয়ে যাওয়ার দিন থেকে আর ও ৫ মাস বেঁচেছিল । ১৪ই নভেম্বর ২০১১
শিশু দিবসে তার মৃত্যু হয় ।
এই গল্প কাল্পনিক । এই গল্পটাতে চরিত্র গুলো কাল্পনিক । আমার ভাবনা দিয়ে তৈরি । আমার ভাষা দিয়ে সাজানো । যদি এটাই সত্যি এই ধরনের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে আমাদের দেশে । আপনারা অনেক এই প্রকার অমানুষিক ঘটনা শুনেছেন বা পড়েছেন কিন্তু আমার ২৪ বছরের রূপালী পাঁচজন পুরুষের দ্বারা অসংখ্য বার ধর্ষিত হয়েছিল ও ১৫০দিনের অমানুষিক, প্রায় অনাহার ও অত্যাচার তাকে প্রত্যেক মূহুর্তে একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে ছিল এটা যদি সত্য হয় সেটা দুঃস্বপ্নে ও সভ্য মানুষ ভাবতে পারেনা ।
আগামি দিনে আমাদের মা, বোন ও মেয়েদের জন্য এক সভ্যসমাজের দাবিতে চিন্তাশীল ও বুদ্ধিজীবী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান জানাই। জয়হোক মানবিকতার।
No comments:
Post a Comment