Thursday, 15 October 2020

সেই মেয়েটা

সেই মেয়েটা

নাম খুব অদ্ভুত লাগছে তাই তো ? কিন্তু আমার কিছু করার নাই । আমি আগেও কয়েকটা মেয়েদের নিয়ে গল্প লিখেছি । তার মধ্যে পুতুল ও তুতুল আমার খুব প্রিয় । কিন্তু এটা অন্য রকম গল্প। আগের গুলো সমস্যা জর্জরিত গল্প ছিল । এটা মজার ও ভাল লাগার গল্প । সবটাই আনন্দের । আগের গল্প গুলো ছিল কিছুটা বাস্তব ও কিছুটা কাল্পনিক । কিন্তু এটা সম্পূর্ণ বাস্তব ও সত্য ঘটনা । আর যাকে নিয়ে লিখতে বসেছি সে ভীষণ ভাবে বর্ত্তমান ও আমাদের বাসার দুটো বাড়ি পরেই তার বাস । তবে এটাও সত্যি আমি তার নাম জানি না । সেই করনে গল্পটার নাম দিলাম “সেই মেয়েটা “।

যাই হোক । নামে কি আসে যায় । ঘটনাটাই প্রধান । তবে ঘটনা বলার আগে পরিবেশের কিছুটা বর্ণনা প্রয়োজন । এছাড়া তো ছোটগল্প হয়না । ঘটনার স্থান পশ্চিম আফ্রিকার এক বিখ্যাত শহর লেগসের এক জনবহুল বসতি ইলুপেজু । এই ইলুপেজু কথাটার কিন্তু একটা বিশেষ মানে আছে । তবে সে কথা পরে হবে ক্ষণ । এই লেগস শহরটা দারুণ । আমার খুবই প্রিয় শহর । আর এই লেগসে কিছুকিছু এলাকা ভারতীয়দের বাস । এই ইলুপেজুতে বিশেষ করে ভারতীয় বেশি । একসময় এখানে ৯০শতাংশ বাড়িতে ভারতীয়দের বাস ছিল । এখন সেটা কিছুটা কমে ৭০শতাংশে নেমে এসেছে যদিও এখনো এই এলাকা ভারতীয় প্রধান । মিনি ইন্ডিয়া বলা যেতে পারে । এখানই ভারতীয়দের স্কুল , মন্দির ,বাজার ও রেস্টুরেন্টের ছড়াছড়ি । যে সব ভারতীয় পরিবার নিয়ে এই শহরে বাস করে তাদের প্রথম পছন্দ ইলুপেজু বলা চলে । এখানে মোটামুটি সবাই সবাই কে চেনে জানে । একটা ভারতীয় গ্রাম বললে ভুল হয় না।

এই ইলুপেজুতে আমদের বাসা এক সুন্দর পরিবেশে । বেশি হই হট্টগোল নাই । এবং বিশেষ করে এই গলিতে অনেক সমৃদ্ধশালী মধ্যবিত্ত দেশি মানুষের বাস । রাজনৈতিক মানুষের বাসও আছে যে কারণে উপদ্রব কম । আমরা সন্ধ্যে সাতটা আটটা পর্যন্ত আরামসে রাস্তায় ঘুরে বেরাতে পারি । সিকিউরিটির ব্যবস্থা খুবই ভাল ।

মোটামুটি পাঁচটা বাজলেই সবাই রাস্তায় । বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি শুরু করে । পুরুষ ও মহিলারা সান্ধ্যভ্রমনে ব্যস্ত হয়ে পরে । এই কাণ্ডকারখানা চলে যতক্ষণ না আঁধার নেমে আসে । আমার যথারীতি কোন বন্ধুবান্ধব নাই । একাই হাঁটি । অন্যেরা দলবেঁধে হাঁটে । আমার তাতেই সুবিধা । কারণ আমি তো তাদের দেখি । বলা ভাল পর্যবেক্ষণ করি । সে দু থেকে ষাট ছেলে মেয়ে সবাই কে দেখি । মানুষ দেখতে আমার ভাল লাগে । তবে আজ কাল মেয়েদের পর্যবেক্ষণ করতে ভয় করে । একটা নতুন শব্দ শুনছি “স্টক করে” । আমাদের সময় এই শব্দটা ছিলনা । এর মানেটা যে কি জানি না । হয়তো কোন মানেই নেই । আরে বাবা মানুষ না দেখলে লিখবো কি ভাবে । কিন্তু আজ কাল ভয় করে ।

যাই হোক সেই মেয়েটা ও আমাদের পাড়াতেই থাকে । সে যে মেয়ে সেটাই জেনেছি অনেক পরে । প্রত্যেক দুমাস অন্তর ওকে কেউ ন্যাড়া করে দায় । ওর বাবা ও ভাইদের ও একই অবস্থা । আর এই মেয়ের দস্যিপনা ও পোশাক দেখলে বোঝা মুশকিল সে ও একটা মেয়ে । তবে আজকাল দেখেছি কিছুটা মেয়েদের মত পোশাক পরে । কিন্তু দস্যিপনা সমানে চালিয়ে যায় । মোটের উপর সে লবঙ্গলতিকা টাইপ নয় । তবে এখানে ভারতীয় স্কুলের কোন মেয়েই লবঙ্গলতিকা টাইপ নয় । এটা এই স্কুলের এক বিরাট দক্ষতা । আমার ভাল লাগে । কেউ বেশি দস্যি কেউ একটু কম । যাই হোকে আমার এই গল্পের নায়িকা"সেই মেয়ে" ।

হ্যাঁ । যেটা বলে দেওয়া ভাল সেটা হল এই যে আমাদের এই পাড়ার লাগোয়া একা ভাল পার্ক আছে । আমি সেখানেই হাঁটতে ভালবাসি । সেটা কেউ ভারতীয়দের পার্ক বলা ভাল । বিকেল হলেই অনেক ভারতীয় মহিলা পুরুষ কাচ্চা বাচ্চা ভীর করে । মেয়েরা কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলেও তাদের মূল উদ্দেশ্যটা হল জোট-বেঁধে গল্প করা । রোজ কি যে এত কথা বলে বুঝি না । সবাই সারাটা সময় কথা বলে । ঠিক কে যে শুনছে বোঝা মুশকিলে । এই ব্যাপারটা শুধু ভারতীয় মহিলাদের বিশেষত্ব । চাইনিজ বা ইউরোপের মহিলারা কথা বলে না । আফ্রিকান মহিলাদের মধ্যেও এটা দেখিনা । যাইহোক কি আর করা যাবে । আমি পার্কে হাঁটি আর এই সব দেখি । কিছু এদেশীয় বাচ্চা ও খেলা করে । কিন্তু একটা বিশেষ ব্যাপার হল এদেশীয় এবং ভারতীয় বাচ্চারা একসাথে খেলা করে । আমার মনে হয় ভারতীয় বাচ্চাগুলো এদেশে বাচ্চাগুলোর সাথে আন্তরিক ভাবে মিশে যেতে পারে । ওদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ দেখিনা ।

আমার সেই মেয়েটাও মাঝে মধ্যে সেখানে হাজির হয় । তার বাবা ও মা কে ও সেখানে দেখেছি মাঝে মধ্যে । মেয়েটার বয়স ৯ অথবা ৮ । জানিনা কোন ক্লাসে পড়ে । ওর কিছু সমবয়সী মেয়ে বন্ধুও আছে তবে যতদূর মনে হয় সে তার পরোয়া করে না ।

এমনি একটা বিকালে আমি হাঁটবো বলে পার্কে গিয়েছি । বেশ মানুষজনের সমাগম । সবাই ব্যস্ত । বাচ্চা ছেলে মেয়েগুলো মাঠের মধ্যে খেলছে । কেউ বা বল নিয়ে অথবা কেউ সাইকেল এই সব ওদের খেলার বিষয় । আমি দেখেছি সেই মেয়েটাও সেখানে আছে কিন্তু ওর বাবা বা মা কে দেখিনি । তারমানে সে একাই সেখানে হাজির হয়েছে । সে ভাল । এদেশে বাচ্চারা ও মেয়েরা খুব সিকিওর । এখানে মেয়েদের কেউ আলাদা করে দেখে না । খুব ভালবাসে ও সম্মান করে । আর বাচ্চাদের তো সবাই খুব ভালবাসে ও প্রটেক্ট করে ।

হঠাৎ দেখি সেই মেয়েটা আমার দিকে দৌড়ে আসছে ।তার সাথে আমার ফর্মাল আলাপ নাই । কিন্তু রোজই আমাকে দেখে । অবশ্যই চেনে । দেখি তার পেছনে একটা নাইজেরিয়ান ছেলে দৌড়ে আসছে । তারা সমবয়সী । বুঝলাম কিছু গণ্ডগোল বাঁধিয়েছে আমার সেই মেয়ে । কিন্তু আমি কিছু বোঝার বা করার আগে ছেলেটা সেই মেয়েটাকে ধরে তার পিঠে এক সজোরে কিল মারল । আমি খুব আঘাত পেলাম । এই ঘটনার জন্য একদম প্রস্তুত ছিলাম না । মাঠ ভর্তি মানুষ । সবাই দেখল ব্যাপারটা । কিলটা মেরে ছেলেটা বেশ আত্মতুষ্টি পেয়েছে মনে হল । আমি এটাও বুঝলাম আমার সেই মেয়ে নিশ্চয়ই এমন কিছু করেছে যে ছেলেটা এত রেগে গেছে । যাইহোক আমি কিছুটা এগিয়ে মেয়েটাকে ধরে কাছে টেনে নিলাম । সেও আমার কোলে মুখ লুকালে । আমি ভাবলাম বুঝি খুব লেগেছে । ওর পিঠে কয়েকবার মালিস করলাম । ভাবছি কেঁদে ফেলবে নাতো ।এমন সময় হঠাৎ সে আবার ঘুরে দাঁড়ালো । ততক্ষণে ছেলেটা আবার নিজের খেলার স্থানে ফিরে গেছে । এবার মেয়েটা ফিরে চলল ঐ ছেলেটার দিকে । আমি বুঝলাম এবার মহাভারত আসন্ন । আমিও ওর পেছনে চললাম । কয়েকটা সেকেন্ডের মধ্যে সেই মেয়ে ঐ ছেলেটার পিঠে দিল দুই কিল । ছেলেটা মাটিতে বসে পড়লো । হয়তো সে এই ঘটনার জন্য মোটেই তৈরি ছিলনা । চারিদিকে হাহাকার শুরু হল । এ কি হল । এবার নির্ঘাত এক দুঃসময় হাজির হবে । একটা ভারতীয় একটা নাইজেরিয়ান ছেলেকে মারল এ কম ব্যাপার নয় । ছেলেটার বড্ড লেগেছে । সেই মেয়ে কিন্তু সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে । আমি তো হতবাক । কি করি । ছেলেটাকে ধরে ওঠালাম । স্মরি স্মরি বললাম । দেখি ছেলেটা কেঁদে ফেলেছে । মহামুসকিল । হঠাৎ মনে হল এর দ্রুত-সমাধান একটা ই আছে । আমি আমার পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা ২০০ নাইরার নোট বারকরলাম । ছেলেটার হাতে দিলাম । ছেলেটাও মনে হয় এটার জন্য তৈরি ছিলনা । তবে সে অতিদ্রুত নাইরাটা নিয়ে চোখের জল মুঝে নিলো । আমি ভাবি যাক সমস্যা মিটল । এবার সেই মেয়েটার হাত ধরে বললাম “লেটস গো”। সেও আমার সাথে বাড়ির পথে চলল । শুধু কয়েক পা এগিয়ে বলল “ডোন্ট টেল মাম্মা”। আমি বলি “হোয়াট । আই ডিডন্ট শী এনি থিং”। আবার সে আমার হাতটা ছেড়ে লাফাতে লাফাতে বাড়ির পথ ধরল ।……………শেষ ।

 

No comments:

Post a Comment