Thursday, 15 October 2020

শোনপুরের মেলায়

 

আজ কাল দেখি সব স্মার্ট ফোনে একটা ফটো আলবাম্ব থাকে । আমার মনে হয় আমার  মাথায় ভগবান ঐ ধরনের একটা অ্যাপ ডাউনলোড করেদিয়েছিল বহুআগে । সেদিনের ছবি খুব উজ্জল কিন্তু সেদিনের মনটা অনেক পালটে গেছে । সেদিনের ভাবনা  আর আজকের ভাবনার মধ্যে অনেক ফারাক । তাই ছবি সেদিনের হলেও ভাবনার প্রতিফলন হচ্ছে না সেটা বুঝতে পারছি ।

ঢালু মাটির পাড়ে হাতির পাল পা ফেলে জলে নেমে গেল । যত স্নানার্থী,পুণ্যার্থী,ধর্মবাজ বা নৌকাবাজ সবাই সরে গিয়ে হাতিদের রাস্তা করে দিল । মাহুতরা হাতির মাথায় বসে হুঙ্কার ছারছিল আনপড় , বেওকুফ জনতার প্রতি আর প্রবল হুড়োহুড়ি করে আতঙ্কময় চিৎকার করে হাতির পায়ের তলায় পড়তে বেঁচে সবাই সরে গেল হাতিদের রাস্তা করে দিতে । আজ ফিরে দেখলে মনে প্রশ্ন জাগে এতে অনেকের বেইজ্জত-বেআবরু হয়ে পড়া ঘটিবাটি উল্টে পরা , কাপড় চোপড় উল্টে পরা , ঐ লন্ডভন্ড আবস্থা দেখে আমার মত নিরাপদ দর্শকদের এত আনন্দ কিভাবে হচ্ছিল । বিনা পয়সার রগড় । যাইহোক আমরা এগিয়ে চললাম মেলার ভেতর । অজস্র মানুষ । কিন্তু কেন । তীর্থস্নান লাগি । শুনলাম কার্তিক পূর্ণিমায় গন্ডক ও গঙ্গার সঙ্গমে  স্নানের মাহাত্ম্য । এই সব ধর্মীয় ব্যাক্ষা আমার মনে কোন দাগ সেদিন কাটত না । আমি শুধু গিলে চলেছি আজীব ভারতবর্ষের আশ্চর্য এক টুকরোকে ।

যেটা বুঝলাম বেশ কয়েকটা বাগবাজার , শ্যামবাজার ও বালিগঞ্জ কে জুরেদিলে ও শোনপুরের মেলার আন্দাজ পাওয়া মুশকিল । এটার আভাস পেলাম মেলার শুধু এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে । কোন জায়গা খালি নাই । ভরেগেছে মানুষ ও পশুতে । শাড়ি জামাকাপড় ঝুলছে গাছের ডালে ডালে । শুকোচ্ছে । আবার এও দেখলাম কাপড় টানটান করে দুপ্রান্তে দুই মহিলা মুর্তির মত স্থির দাঁড়িয়ে । গাছের তলায় ,জমিতে ক্ষনস্থায়ী বহু সংসার । মাটি খুঁড়ে কাঠ জ্বালিয়ে ফুটিয়ে নিচ্ছে ভাত । রাতে ঐ নিভুনিভু আগুনের পাশেই হয়ত ঘুমিয়ে পরবে । ওদের ময়লা কপড়ে চাদরে খেলাকরে যাবে চাঁদের আলো । দরিদ্র বলে মনে হয় বঞ্চিত হবে না চন্দিল আর্শীবাদের । এটা এখন মনে হচ্ছে । সেদিন হয়নি ।

কিন্তু শোনপুরের মেলায় শুধু দরিদ্র মানুষ আসে না । এসেছে বহু ধনী ব্যবসায়ী । তাদের ব্যবস্থা আলাদা । সাড়ি সাড়ি সুন্দর সাদা তাঁবু টানটান দড়ি দিয়ে বাঁধা সাজানো আস্তানা । কেতাদুরুস্ত পুরুষ । পুরুষ্টু গোঁফ । দৃপ্ত চাহনি । বন্ধুকের ছড়াছড়ি । এরা এসেছেন জানোয়ার বেচতে বা কিনতে । মিনিমাম একটা হাতির দাম ছিল দশলাখ । আমি খুব আস্তে একবার জানতে চাইলাম “হাতি কিনে কি লাভ হয়”। আমাদের বডিগার্ড বলে বাবুসাব (ক্ষত্রিয় বা ঠাকুরদের বাবুসাব বলে ডাকা হয়) “পনের লাখের গাড়ি তো সবকো দড়ওয়াজা পে মিলেগা লেকিন দড়ওয়াজে পে এক হাঁতি হোনেকা ইজ্জত আলাগ হোতাহ্যায়”। আমি মনে মনে “খটুয়া”।

এদিকে মেলার রূপটা একদম অন্য রকম । সারসার সাজানো গোছানো হাতি দাঁড়িয়ে আছে । টন টন ঘাস খর আখ সাপ্লাই চলছে । চেনদিয়ে হাতিদের পা বাঁধা । অনেকে প্রনাম করছে হাতিদের । এখানে মেলা অনেক সাজানো । মধ্যে চওড়া রাস্তা । দুপাশে তাঁবু । রাস্তার ধারে অসংখ্য হার দুল বিন্দি ও চুড়ির দোকান । দোকানের শেষ নাই । পাওয়া যাচ্ছে অঢেল লিট্টি । ভাজা হচ্ছে অফুরন্ত ছাতুর কচুড়ি । পাশেই রসে চোবানো জিলিপি । নকুলদানা আর বহু রং বেরং এর মিষ্টি । থোকা থোকা বাঁসি নিয়ে ঘুরছে বাঁসি ওয়ালা । লুধিয়ানার কম্বল তোশক বিছানার দোকান ও অডেল । রাস্তা দিয়ে চলেছে কাতারে কাতারে মানুষ । সাধু অসাধু আমির গরিব মর্দ জেনান অবিশ্রান্ত । এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মেলায় উর্দিধারী পুলিশ আছে তবে তারা বন্ধুকবাজ ভিইপি দের তোষামদে ব্যস্ত । প্রশাসনিক স্তরে স্বাথ্য সচেতনতার লেশমাত্র ছিল না । কিছু টিউবয়েল ছিল । তখন মিনারেল ওয়াটার ছিলনা । অতঃপর শুধু চা । পুরুষ দের জন্য কোনও শৌচালয় নাই । মহিলাদের ও ছিলনা । প্রশ্নটা সেদিন মনে আসে নি তবে ভাবছি তালে কি হত? কিন্তু ঐ ব্যাপারে জনসাধরনের বিন্দু মাত্র মাথাব্যাথা কারো ছিলনা একথা হলপ করে বলাযায় ।

ঘুরতে ঘুরতে চলে এলাম মেলার দক্ষিনপশ্চিম কোনে । সূর্য মামা পশ্চিমে ডলে পরেছে । বুঝতে পারছি ঠান্ডা বারছে । এই কোনটাকে আজকের ভাষায় বলাযেতে পারে ফুডকোর্ট । বিভীসিকাময় চাট কচুড়ি মাছভাজা কুলফি-চানার নানা স্টল । এখানে টাটা কম্পানীর গাড়ির স্টল ও দেখলাম ।নানা রকম ঘুর্নি নাগরদোলা । আর আছে দুঃসাহসিক খাঁচার ভেতর মোটর সাইকেলের মরণ খেলা ।

রাস্তাদিয়ে ভিড় ঠেলে হাড়ি কুড়ি বাক্সপ্যাটরা দোকান পার হয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম গোরুর মোষের মেলায় । গোরুর শরীরে গোলাপি স্টাম্প আর মোষের শরীরে হলুদ স্টাম্প মালিকের স্মারক । আর আছে ঘোড়া । তাদের রাখা আছে অনেকটা প্লেবয় মার্কা স্টাইলে । ঘোড়া যথারীতি ভদ্র সভ্য । দানা পানি সেবনে ব্যস্ত । তৈরি হয়েছে রিং । রিং এর পাসে দাঁড়িয়ে মানুষ । ওস্তাদরা রিং এর ভেতর দুরন্ত গতিতে ঘোড়া ছোটাচ্ছ । আর জনতা উন্মাদের মত ছিৎকার করছে ।

মেলা দেখতে আসা কলকাত্তাইয়া বঙ্গ চোখে পরেনি তবে লাল মুখো টুরিস্ট ও চোখে পরার মত ছিল না। বুঝলাম তখনও বিহার নিজেকে সে ভাবে বিক্রি করতে পারে নি । দেশজ ফ্লেবার তখনও ছিল অটুট । সরকারি ব্যবস্থায় মেলায় ইলেকট্রিক আলো জ্বলে উঠল । বিহার ছিল লোডশেডিং এর জন্য কুক্ষ্যাত । লোডসেডিং হলে ঐ মেলার কি ভয়ংকর পরিস্থাতি হত আজ মনে হলে সিউরে উঠি । তবে সারা মেলা আলোতে ঝলমলিয়ে উঠেছে । স্তিমিত সন্ধ্যার আলো ইলেকট্রিক আলোর রোশনাই কে স্বীকার করে নিঃশব্দে সরে গেছে ।  পাশে সার্কাসের তাঁবুর মতো নানা রকমের আয়োজন । টিকিট ঘরের সামনে জমজমাট ভীর । শুনলাম রাতগড়ালে শুরু হবে নৌটঙ্কি নাচ । নামেই নাচ আসলে নাকি হিংস্র বর্বর যৌন প্রদর্শন । আছে মাসলম্যানরা । জন্তু বললেই পশু শব্দটা চলে আসে । কিন্তু জান্তব বা পাশবিক রা হয় পশুর থেকেও ভয়ংকর । তার প্রমান পেলাম একটু পরে ।

আমি স্কুলের গন্ডি ছাড়িয়ে কলেজে ডুকে খুব গালি দিতে শিখেছিলাম । তখন মনে হত ওটাই বুঝি ছিল মর্দনি । কলেজ ছাড়িয়ে কর্মজগতে পৌঁছে উত্তরপ্রদেশ গিয়ে শিখে ছিলাম যাতপাতের হিসাব । আমরা ঐ মেলার এক প্রান্তে যেখানে গঙ্গা আর গন্ডক এর সঙ্গম হয়েছে সেখানে পৌঁছালাম । এখানে পৌঁছে দিশেহারা হয়ে পরলাম । আমার ধারনা ছিলা এই মেলার একপ্রান্তে যেখানে গরিবীর মর্মন্তিক প্রকাশ তারই অপরপ্রান্তে এত ঐর্শয্য ছড়িয়ে আছে । বিরাট বিরাট এলাকা জুরে তৈরি হয়েছে অনেকটা রেস্টুরেন্টের মত পান্থনিবাস । থাকা ও খাওয়ার এলাহি আয়োজন । এই প্রান্তে নিম্নযাতে মানুষ ও পশু নট আলাউড । সারি সারি বিভিন্ন ধরনের মোটরগাড়ি । জানান দিচ্ছে আভিযাত্যের বড়াই । জৌলুস দেখলেই বোঝাযায় এ সর্বসাধরের জন্য নয় । ভীস্মপ্রতাপ এখানে কিছু খাওয়ার কথা বললেও আমার উৎকন্ঠা দেখে সরাসরি বলল এটা তাদের এলাকা । আর ওর কাকা নাকি এই এলাকার খুব নামি দামি মানুষ । সকলেই একঠাকে চেনে । এই হোটেল গুলোর মধ্যে একটা তাদের । আমরা ইচ্ছা করলে থাকতেও পারি তবে থাকার ফরমান নাই । আজ আমার জন্য বিশেষ রাত্রিভোজের আয়োজন হচ্ছে ওদের বাড়িতে । তাই আমাদের ফিরতে হবে । আমরা একটা রেস্টুরেন্টে বসলাম আর সেখানই পেলাম এই মেলার অন্ধকারতম দিকটার পরিচয় ।

এই আস্তানাগুলোতে হয় মানুষের কেনা বেচা । যার মুল্য হাতির দামের কাছে কিছুই না । আছে দালাল আছে মোড়ল আছে নেতা আছে অধিকারী । সবার সহযোগীতায় চলে মানুষ এর বাজার ।

শোনপুরের মেলাই মানুষ ও পশুর সহাবস্থান । মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন ঘোরাফেরা করতে শুরু করল । এক দিশেহারা মন নিয়ে নদীর ধারে ফিরে এলাম সন্ধ্যার অন্ধকারে । উল্টোদিকে হাজিপুরের দিকের তীরে পর পর আলো জ্বলছে । তার প্রতিফলন ভাসছে জলে । এপারে এক অন্য এক ফেরি ঘাট । এ ঘাটে নিচু যাতের মানুষ নটআল্যাউড । লঞ্চ এ উঠে বসলাম । কিছু যেতেই দেখলাম এক ঘাটে অনেক মানুষ তারা সারি সারি প্রদীপ জ্বালিয়ে জলে ভাঁসিয়ে দিচ্ছে । পুজো পাঠ চলছে । ধর্ম বিশ্বাস রীতির ব্যাপারে আমি সম্পূর্ন অজ্ঞান ছিলাম । শুধু এক আশ্চর্য মাদকতার আভাস পেয়েছিলাম । আজ বুঝি সে ছিল এক ধর্ম অধর্মের মহাসঙ্গম । ইচ্ছা করে বার বার ফিরে যেতে ঐ মহাসঙ্গমে আর মিশে যেতে ঐ ম্যযুগীয় প্রায়ান্ধকার মানবজমিনপ্রান্তে দাঁড়িয়ে কার্তিক পূর্নিমার নীলআকাশে সোনার থালার মত চাঁদটাকে প্রানভরে দেখতে । …………………………………সমাপ্ত  

No comments:

Post a Comment